সিলেটে ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল ৪ অটোরিকশা যাত্রীর, নিহতদের মধ্যে ২ জন নারী





সিলেট নগরীর সুবহানীঘাট এলাকায় বুধবার সকালে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকচাপায় ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন ৪ জন অটোরিকশা যাত্রী। নিহতদের মধ্যে ২ জন নারী ও ২ জন পুরুষ রয়েছেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অটোরিকশার চালকসহ আরও ২ জন। 


যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সিলেট-জকিগঞ্জ মহাসড়কের সুবহানীঘাট পয়েন্টে একটি সিএনজি অটোরিকশা যাত্রী নিয়ে নগরের দিকে যাচ্ছিল। এসময় বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগামী একটি বালুবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। 


ট্রাকের চাকার নিচে পড়ে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান ভেতরে থাকা ৪ যাত্রী। চিৎকার শুনে স্থানীয়রা ছুটে এসে আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। 


নিহতরা হলেন— সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বাসিন্দা রোকসানা বেগম, ৩৫; তার মেয়ে সুমাইয়া আক্তার, ১২; কোম্পানীগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল মালিক, ৪৫; এবং দক্ষিণ সুরমার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম, ৫০। আহত অটোরিকশা চালক রহিম মিয়া, ৩০, এবং আরেক যাত্রী মিনা বেগম, ২৮, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।


চালকের বেপরোয়া গতি ওভারলোডই কাল হলো


পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বালুবাহী ট্রাকটি ওভারলোড ছিল এবং চালক অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সুবহানীঘাট এলাকায় সকালের ব্যস্ত সময়ে হঠাৎ বাঁক ঘোরাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। ট্রাকটি অটোরিকশাকে পাশ কাটাতে গিয়ে চাপা দিয়ে দেয়। 


দুর্ঘটনার পর ট্রাকচালক পালিয়ে যান। পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করেছে এবং চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ আলী মাহমুদ। “আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। বেপরোয়া গতি ওভারলোডিং দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে হচ্ছে,” বলেন তিনি।


নিহতদের স্বজনদের আহাজারি


খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন নিহতদের স্বজনরা। রোকসানা বেগমের স্বামী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “আমার বউ আর মেয়ে ডাক্তার দেখাতে সিলেটে যাচ্ছিল। এখন লাশ হয়ে ফিরল।” 


নুরুল ইসলামের ছেলে জানান, তার বাবা দৈনিক মজুরির কাজ করতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। 


স্থানীয়রা জানান, সুবহানীঘাট পয়েন্টে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তা সরু, ফুটপাত নেই, আর বালুবাহী ট্রাকগুলো বেপরোয়া চলে। “প্রশাসন বারবার অভিযানের কথা বলে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না,” ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় দোকানদার জসিম উদ্দিন।


সিলেটে বাড়ছে সিএনজি দুর্ঘটনা


সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিলেটে সিএনজি অটোরিকশা জড়িত দুর্ঘটনায় ২৮ জন মারা গেছেন। এর প্রধান কারণ— ছোট যানবাহনগুলোর সামনে হঠাৎ ভারী যানবাহন চলে আসা, চালকদের অসতর্কতা এবং ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিএনজি অটোরিকশার গঠনগত দুর্বলতা এবং নিরাপত্তা ফিচারের অভাবও মৃত্যুর হার বাড়াচ্ছে। ভারী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে অটোরিকশার যাত্রীদের বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।


দাবি উঠেছে কঠোর নিয়ন্ত্রণের


দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা সুবহানীঘাট-জকিগঞ্জ সড়কে বালুবাহী ট্রাক চলাচল সীমিত করার দাবি জানান। তাদের দাবি, সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভারী যান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি অটোরিকশার জন্য আলাদা লেন ও গতি নিয়ন্ত্রণের দাবিও উঠেছে।


সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। একইসঙ্গে দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


কী করণীয়


এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলছেন:

১. নগরের ভেতরে ভারী যান চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া  

২. ওভারলোড ট্রাকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা  

৩. সিএনজি চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই  

৪. ব্যস্ত মোড়গুলোতে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো  

৫. অটোরিকশার নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা  


সিলেটের সুবহানীঘাটের এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, সড়কে শৃঙ্খলা না থাকলে ছোট যানবাহনের যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, এক মুহূর্তের অসতর্কতা— কেড়ে নেয় পুরো পরিবারের হাসি। 


প্রশাসনের পাশাপাশি চালক, মালিক ও সাধারণ মানুষের সচেতনতাই পারে এই মৃত্যু থামাতে। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।