পদ্মা নদীতে বাসডুবি: তৃতীয় দিনেও চলছে উদ্ধার, মৃত্যু বেড়ে ২৬
মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনায় উদ্ধার অভিযান টানা তৃতীয় দিনেও চলছে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত নদী থেকে ২৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন। জীবিত উদ্ধার হয়েছেন ১২ জন।
যেভাবে ডুবল বাসটি
শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বরিশাল থেকে ঢাকাগামী “শ্রাবণী পরিবহনের” একটি বাস মাওয়া ফেরিঘাট থেকে ফেরিতে উঠছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ফেরির র্যাম্পে উঠার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। বাসটি হঠাৎ ডান দিকে কাত হয়ে পদ্মায় পড়ে যায়।
মুহূর্তের মধ্যে বাসটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ভেতরে থাকা যাত্রীরা চিৎকার শুরু করলেও দ্রুত স্রোত আর কুয়াশার কারণে উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়। স্থানীয় জেলেরা প্রথমে এগিয়ে এসে ৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন। পরে ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
উদ্ধার অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্রোত ও কুয়াশা
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক শাহজাহান শিকদার জানান, পদ্মার তীব্র স্রোত ও ৪-৫ ফুট গভীর কাদার কারণে ডুবুরিদের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। “বাসটি ৩৫ ফুট পানির নিচে আড়াআড়ি হয়ে আছে। দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য। তাই মৃতদেহ খুঁজে বের করতে সময় লাগছে,” বলেন তিনি।
নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে আনা হয়েছে বিশেষ সোনার ডিভাইস। সেটি দিয়ে পানির নিচে বাসের অবস্থান শনাক্ত করে ডুবুরিরা একে একে মৃতদেহ বের করে আনছেন। সোমবার সকালেই আরও ৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। মৃতদের মধ্যে ১ জন নারী, ৯ জন পুরুষ ও ৬ জন শিশু রয়েছে।
নিহতদের তালিকা ও স্বজনদের আহাজারি
নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির বাসিন্দা। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
পিরোজপুরের স্কুলশিক্ষিকা রাবেয়া খাতুন, ৪২
তার দুই সন্তান সাব্বির, ১০ ও সাদিয়া, ৭
ঢাকাগামী পোশাকশ্রমিক রফিকুল ইসলাম, ৩০
বৃদ্ধা জাহানারা বেগম, ৬৫
মাওয়া ঘাটে স্বজনদের ভিড়। কান্না, আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। রাবেয়া খাতুনের স্বামী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “বাচ্চা দুইটাকে নিয়ে ঢাকায় বোনের বাসায় যাচ্ছিল। এখন লাশ হয়ে ফিরল।”
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মৃতদেহগুলো ময়নাতদন্তের পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
চালকের গাফিলতি ও ফেরির অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পরপরই বাসচালক ও হেলপার পালিয়ে যান। পুলিশ তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাসটির ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ছিল। এছাড়া চালক ক্লান্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ফেরির র্যাম্পে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। কুয়াশার কারণে ভিজিবিলিটি কম থাকলেও ফেরি চলাচল বন্ধ করা হয়নি।”
স্থানীয়রা বলছেন, মাওয়া ঘাটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। ফেরির সংখ্যা কম, যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেশি। “প্রশাসন শুধু আশ্বাস দেয়, কাজ হয় না,” ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঘাটের শ্রমিক আব্দুল কাদের।
পদ্মায় বাসডুবির ইতিহাস
পদ্মা নদীতে এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালে একই ঘাটে ট্রাকসহ ফেরিডুবিতে ১৮ জন মারা যান। ২০২১ সালেও বাস উল্টে ১২ জনের প্রাণহানি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মার স্রোত, আবহাওয়া ও ঘাটের অব্যবস্থাপনাই বারবার প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “ফেরিঘাটগুলোতে রাতে ও কুয়াশায় চলাচল বন্ধ করতে হবে। চালকদের বিশ্রাম, বাসের ফিটনেস এবং ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।”
সরকারের পদক্ষেপ ও ক্ষতিপূরণ
দুর্ঘটনার পরপরই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা এবং আহতদের ২৫ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আবু নাসের বেগ বলেন, “নিখোঁজদের উদ্ধারই এখন প্রধান লক্ষ্য। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দল মাঠে থাকবে।”
তিনি আরও জানান, মাওয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটে রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
যা করা দরকার এখনই
এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, নৌপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল। বিশেষজ্ঞদের মতে:
১. ফেরিঘাটে রাত ও কুয়াশায় চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে
২. বাসের ওভারলোড ও চালকের ডিউটি আওয়ার কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে
৩. প্রতিটি ফেরিতে লাইফ জ্যাকেট, লাইট ও উদ্ধার সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করতে হবে
৪. ডুবুরি ও রেসকিউ টিমের আধুনিক সরঞ্জাম বাড়াতে হবে
পদ্মার পানিতে হারিয়ে যাওয়া ২৬টি প্রাণ আর ফিরবে না। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্না যেন বৃথা না যায়, সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা।

0 মন্তব্যসমূহ