রাজধানীতে ফোম কারখানায় ভয়াবহ আগুন, ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় বড় বিপর্যয় এড়াল ঢাকা
ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকায় বুধবার বিকেলে একটি ফোম কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখা আশপাশের অন্তত ৩টি কারখানায় ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের টানা ২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ মালামাল পুড়ে গেছে।
যেভাবে ছড়াল আগুন
প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানার শ্রমিকরা জানান, বিকেল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে ‘ঢাকা ফোম ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামের কারখানার স্টোররুম থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। প্রথমে শ্রমিকরা নিজেরাই পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোম, কেমিক্যাল ও কাপড়ের গোডাউন হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
মিনিট দশেকের মধ্যে পুরো কারখানা ধোঁয়া ও আগুনে ঢেকে যায়। শ্রমিকরা হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে আসেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর, সদরঘাট ও সাভার স্টেশনের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোন-২ এর উপসহকারী পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, “কারখানায় দাহ্য পদার্থ বেশি থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। পাশাপাশি সরু গলি ও পানির স্বল্পতা আমাদের কাজ কঠিন করে তুলেছিল। তবুও আমরা সময়মতো আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি।”
২ ঘণ্টার লড়াই, এড়াল বড় বিপর্যয়
আগুন লাগার খবর পেয়ে আশপাশের কারখানার শ্রমিকরাও আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন। পুরো এলাকায় কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। বাতাসে প্লাস্টিক পোড়া গন্ধে শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, আগুন যদি নিয়ন্ত্রণে না আসতো তবে পাশের প্লাস্টিক ও গার্মেন্টস কারখানায় ছড়িয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হতো।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তিন দিক থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নেভান। বিকেল ৬টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে কুলিং অপারেশন চালিয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত ডিউটি করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
কেরানীগঞ্জ ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “কারখানায় ফায়ার সেফটির ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। এ ধরনের দাহ্য পদার্থের কারখানায় নিয়মিত ফায়ার ড্রিল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক।”
ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়াবে
কারখানার মালিক মো. কামাল হোসেন জানান, আগুনে প্রায় ৩ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। মেশিন, কাঁচামাল, তৈরি ফোম, গদি ও প্যাকেজিং মালামাল সবই নষ্ট হয়ে গেছে। “আমার ১৫ বছরের পরিশ্রম এক নিমিষে শেষ। কারখানায় ১২০ জন শ্রমিক কাজ করতো। এখন কী হবে জানি না,” কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন তিনি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। কারখানার বৈদ্যুতিক লাইন পুরনো ও এলোমেলো ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক, চাকরি হারানোর শঙ্কা
আগুনের ঘটনায় কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকেই জানেন না আগামীকাল থেকে তারা কাজে যোগ দিতে পারবেন কিনা। শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, “এই কারখানায় ৭ বছর ধরে কাজ করি। এখন কারখানা পুড়ে গেল। সংসার চলবে কীভাবে?”
শ্রমিক নেতা মো. সেলিম বলেন, “মালিকপক্ষ যেন দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেয় এবং কারখানা পুনরায় চালু করে। ১২০ জন শ্রমিকের পরিবার এখন অনিশ্চয়তায়।”
কেরানীগঞ্জে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা
কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, কালীগঞ্জ ও আগানগর এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ৫০ ফোম, প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল কারখানা রয়েছে। এর বেশিরভাগই আবাসিক এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ কারখানায় ফায়ার সেফটি, ইমার্জেন্সি এক্সিট ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা জেলায় শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই কেরানীগঞ্জ ও সাভার এলাকায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার আশপাশে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ফায়ার অডিট ও মনিটরিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও তদন্ত কমিটি
ঘটনার পরপরই কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, “আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। দোষী পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের তালিকা করে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি এলাকার সব ঝুঁকিপূর্ণ কারখানায় অভিযান চালানো হবে।
যা করণীয় এখনই
ফায়ার সার্ভিস ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু পদক্ষেপ জরুরি:
১. দাহ্য পদার্থের কারখানায় অটোমেটিক ফায়ার স্প্রিংকলার ও স্মোক ডিটেক্টর বসানো বাধ্যতামূলক করা
২. প্রতি ৩ মাসে ফায়ার সেফটি অডিট ও ড্রিল করা
৩. বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা ও মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্র বদলানো
৪. আবাসিক এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা স্থানান্তর করা
৫. শ্রমিকদের প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ দেওয়া
কেরানীগঞ্জের এই আগুন আবারও মনে করিয়ে দিল, অবহেলা আর অনিয়মের দাম দিতে হয় বড় ক্ষতির মাধ্যমে। এবার প্রাণহানি না হলেও পরেরবার হয়তো এত ভাগ্য ভালো নাও থাকতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ