*রংপুরে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ: পাঁচ ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানিবন্দি ১৫ হাজার পরিবার*
টানা পাঁচ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে রংপুর নগরীর প্রায় ৪০টি পাড়া-মহল্লা হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে নগরীর নিম্নাঞ্চলের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি দুপুর পর্যন্ত থামেনি। এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে এবং নগরবাসীকে পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে।
ডুবে গেছে নিম্নাঞ্চলের এলাকা
নগরীর কেরানীপাড়া, সাতমাথা, ধাপ, মুন্সিপাড়া, নিউ শালবন, মাহিগঞ্জ, তালপট্টি, গুপ্তপাড়াসহ অন্তত ৪০টি এলাকায় পানি জমে গেছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর সমান পানি। রাস্তাঘাট নদীতে পরিণত হওয়ায় রিকশা, অটো, মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে পারেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভোর ৫টার দিকে ঘুম ভেঙে দেখি ঘরের ভেতর পানি ঢুকছে। জিনিসপত্র উঁচুতে তুলতেই সকাল চলে গেল। এখন রান্না-বান্না বন্ধ, বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারেনি।”
নগরীর প্রধান সড়ক সেন্ট্রাল রোড, স্টেশন রোড, জাহাজ কোম্পানির মোড়েও পানি জমে যানজট তৈরি হয়। দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে। নিচু এলাকার দোকানিরা মালামাল সরাতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা
বার জলাবদ্ধতার মূল কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। রংপুর সিটি করপোরেশনের একাধিক ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকায় পানি নামতে পারছে না। খাল-নালাগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথও বন্ধ।
নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টি হলেই একই অবস্থা হয়। ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চললেও তা পর্যাপ্ত নয়। ভারী বৃষ্টি হলে পানি আটকে যায়।”
সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্প চালানো হচ্ছে এবং দ্রুত ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। তবে বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয় বলে জানান কর্মকর্তারা।
পানিবন্দি মানুষের ভোগান্তি
পানিবন্দি হয়ে পড়া পরিবারগুলো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ওষুধের সংকটে পড়েছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা না হলেও অনেক শিক্ষার্থী যেতে পারেনি। জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গৃহিণী সাবিনা বেগম বলেন, “চুলায় আগুন জ্বালানো যাচ্ছে না। শুকনো খাবার যা ছিল তাও শেষ। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। কেউ দেখতে আসছে না।”
বয়স্ক ও শিশুরা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, পানি নেমে গেলে ডায়রিয়া, চর্মরোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
রংপুর জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে। ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরা মাঠে রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। পানি নামার সাথে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।”
সিটি করপোরেশন থেকে জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য অতিরিক্ত মোটর বসানো হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পানি সরাতে কাজ করছে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সংগঠনগুলো বলছেন, প্রতি বছর একই সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। অস্থায়ী সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ড্রেনেজ পরিকল্পনা ও খাল পুনরুদ্ধার জরুরি।
নাগরিক মঞ্চের নেতা বলেন, “বৃষ্টি প্রকৃতির বিষয়, কিন্তু জলাবদ্ধতা মানবসৃষ্ট। ড্রেন-খাল দখলমুক্ত করে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করলে রংপুরবাসীকে প্রতি বর্ষায় ভুগতে হবে।”
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নগর উন্নয়নের সাথে জলাধার সংরক্ষণ ও সবুজায়ন বাড়ানো দরকার। নইলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের দুর্যোগ আরও বাড়বে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর অঞ্চলে আরও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে।
নগরবাসীকে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া, বিদ্যুতের খুঁটি ও খোলা ড্রেন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।
টানা বৃষ্টিতে রংপুরের মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে। দ্রুত পানি না নামলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নয়, স্থায়ী সমাধানের পথে এগোবে।

0 মন্তব্যসমূহ