*হজে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের মৃত্যু: চলতি বছর সৌদিতে ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত*



চলতি বছর পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে সৌদি আরবে এ পর্যন্ত ২১ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সৌদিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হজ মিশন। মৃতদের বেশিরভাগই বার্ধক্যজনিত জটিলতা, হিটস্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে।


মৃত্যুর কারণ ও পরিসংখ্যান


হজ মিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১০ জুন থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মারা যাওয়া ২১ জনের মধ্যে ১৬ জন পুরুষ ও ৫ জন নারী। মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং বার্ধক্যজনিত দুর্বলতাকে উল্লেখ করা হয়েছে। 


সৌদি আরবে এ বছর তীব্র গরমে তাপমাত্রা ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় হজযাত্রীদের শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে আরাফাতের ময়দান, মুজদালিফা ও মিনায় অবস্থানের সময় অতিরিক্ত গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।


হজ মিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “মৃতদের অধিকাংশের বয়স ৬০-এর বেশি। গরম ও ভিড়ের কারণে তারা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েন। আমরা প্রতিটি মৃত্যুর তথ্য পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছি।”


চিকিৎসা ও সেবা ব্যবস্থা


বাংলাদেশ হজ মিশনের অধীনে মক্কা ও মদিনায় মেডিকেল সেন্টার চালু রয়েছে। এ বছর ১২০ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর একটি দল হজযাত্রীদের সেবায় নিয়োজিত আছেন। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স ও মোবাইল মেডিকেল টিমও কাজ করছে।


ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অসুস্থ হজযাত্রীদের সৌদি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত গরম ও ভিড়ের কারণে অনেক সময়মতো চিকিৎসা পৌঁছানো সম্ভব হয় না।


এক চিকিৎসক বলেন, “বয়স্ক ও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপে ভোগা হজযাত্রীদের জন্য গরম সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আমরা বারবার বলছি, দুপুরে বাইরে না বের হতে, পর্যাপ্ত পানি পান করতে। কিন্তু আবেগের কারণে অনেকে তা মানেন না।”


পরিবারের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া


দেশে থাকা মৃত হজযাত্রীদের পরিবারগুলো শোকাহত। অনেকেই বলছেন, হজে যাওয়ার আগে বয়স্ক স্বজনদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি ছিল। 


ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, “আমার বাবা ৭২ বছর বয়সে হজে গিয়েছিলেন। হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন। আমরা জানতাম না এত গরম হবে। সরকারের উচিত বয়স্কদের জন্য আলাদা গাইডলাইন দেওয়া।”


অন্যদিকে অনেক হজযাত্রী বলছেন, হজ মিশনের সেবা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। তবে গরমের তীব্রতা মোকাবিলায় আরও প্রস্তুতি দরকার।


সরকারের পদক্ষেপ ও সতর্কতা


ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হজযাত্রীদের জন্য স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। প্রাক-হজ প্রশিক্ষণে চিকিৎসকরা গরম মোকাবিলার উপায়, পর্যাপ্ত পানি পান, ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহারের পরামর্শ দেন।


এ বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮৭ হাজার হজযাত্রী সৌদি আরবে গেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ১০ হাজার এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ৭ হাজার। 


হজ মিশন সূত্রে জানা গেছে, মৃতদের মরদেহ সৌদি আরবেই দাফন করা হয়েছে তাদের পরিবারের সম্মতিতে। ইসলামী রীতি অনুযায়ী মক্কা ও মদিনার কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।


বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স্ক ও অসুস্থ হজযাত্রীদের জন্য হজে যাওয়ার আগে পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে ছায়াযুক্ত পথ, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ ও শীতলীকরণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।


ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “হজ শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন ইবাদত। ৬০ বছরের বেশি বয়সী, হৃদরোগী ও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি। পরিবারের সদস্যদের উচিত তাদের অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া।”


তিনি আরও বলেন, হজের সময় হিটস্ট্রোকের লক্ষণ—মাথা ঘোরা, বমি, দুর্বলতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া—দেখা দিলে দ্রুত ছায় নিয়ে পানি পান করাতে হবে এবং নিকটস্থ মেডিকেল সেন্টারে যোগাযোগ করতে হবে।


পরবর্তী করণীয়


হজ মিশন জানিয়েছে, বাকি হজযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। মিনা ও আরাফাতে বিশেষ মেডিকেল বুথ চালু রয়েছে। হজযাত্রীদের মোবাইলে নিয়মিত এসএমএস দিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে।


ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি প্রতিটি হজযাত্রী যেন সুস্থভাবে হজ শেষ করে দেশে ফিরতে পারেন। সবার কাছে অনুরোধ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, অতিরিক্ত পরিশ্রম করবেন না।”


হজ ফ্লাইট আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হবে। ফিরতি হজযাত্রীদের জন্যও বিমানবন্দরে মেডিকেল টিম প্রস্তুত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।


হজে মৃত্যুবরণকারী সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছেন হজ মিশনের কর্মকর্তারা। একইসাথে বাকি হজযাত্রীদের সুস্থতা ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য দোয়া চেয়েছেন তারা।