পার্বতীপুর জংশনে নতুন বিশ্রামাগার: এসি আছে কিন্তু ফ্যান চলে না*  



*উন্নয়ন vs বাস্তবতা। স্যাটায়ার কাজ করে – উদ্বোধন হইছে, কিন্তু কাজের না।*


*উদ্বোধনের ব্যানারটা এখনো টানটান*  


 সকালে পার্বতীপুর জংশনে লাল-নীল বেলুন, ফিতা আর মাইকের আওয়াজে নতুন যাত্রী বিশ্রামাগারের উদ্বোধন হলো। ব্যানারে বড় বড় করে লেখা “আধুনিক যাত্রীসেবা”, “ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়া”। মঞ্চে বক্তারা বললেন, “এবার যাত্রীরা গরমে আর কষ্ট পাবেন না। এসি বিশ্রামাগার, ওয়াইফাই, চার্জিং পয়েন্ট – সব আছে।”  


কথা সত্য। এসি মেশিন ঝুলছে। দেয়ালে “Central AC” লেখা স্টিকার চকচক করছে। টাইলস চকচকে। মোবাইল চার্জের জন্য ৬টা পয়েন্টও আছে।  

শুধু একটা ছোট সমস্যা – এসি চলে না। আর ফ্যান? সেটাও চলে না।


*এসি আছে, ঠান্ডা নাই*  


উদ্বোধনের পরদিন দুপুর ১২টায় বিশ্রামাগারে ঢুকলাম। বাইরে ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা। ভিতরে ঢুকে মনে হলো ওভেনে ঢুকেছি।  

এসি মেশিনের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী রফিকুল বললেন, “উদ্বোধনের দিন রাতে ২ ঘণ্টা চলছিল। পরদিন সকাল থেকে অফ। স্টাফ বলে, কারেন্টের লোড নেয় না।”


স্টাফকে জিজ্ঞেস করলাম, ফ্যানটা অন করে দেন। তিনি হেসে বললেন, “স্যার, ফ্যানের লাইনই কাটা। এসি চললে ফ্যান লাগে না, এই প্ল্যান ছিল। এখন এসি না চলায় গরম লাগলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ান।”  


মানে উন্নয়নের লজিক সোজা: এসি কিনেছি, এসি চলবেই। না চললে সেটা যাত্রীর সমস্যা।


*উন্নয়ন vs বাস্তবতা*  


এই বিশ্রামাগারের বাজেট ছিল ১৮ লাখ টাকা। ১২ লাখ গেছে এসি, টাইলস, লাইটে। বাকি ৬ লাখ গেছে “উদ্বোধন ম্যানেজমেন্টে”।  

ফলাফল: ফটোশুটের জন্য পারফেক্ট জায়গা। কিন্তু ৫ মিনিট বসলে ঘামে গোসল।


রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম না বলার শর্তে বললেন, “টেন্ডারে এসি লেখা ছিল, ফ্যান লেখা ছিল না। তাই ফ্যানের লাইন টানা হয়নি। এখন আবার বরাদ্দ চাইলে ৩ মাস লাগবে।”  


মানে সিস্টেমটা এমন – প্ল্যানে না থাকলে মানুষ গরমে সিদ্ধ হলেও চলবে। কাগজে উন্নয়ন হলেই হলো।


*যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া*  


ঢাকাগামী একতা এক্সপ্রেসের যাত্রী সুমি আক্তার বললেন, “টিকিটের দাম বাড়ছে, সেবা কমছে। এসি রুম দেখে ভাবলাম বাঁচলাম। ঢুকে দেখি ভাপা পিঠা হয়ে গেলাম।”


একজন বৃদ্ধ যাত্রী দেয়ালে হেলান দিয়ে বললেন, “আগে প্ল্যাটফর্মের গাছের নিচে বসতাম। বাতাস পেতাম। এখন ‘আধুনিক’ রুমে ঢুকে দম বন্ধ হয়ে আসে।”


সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি ভাইরাল। ক্যাপশন: “পার্বতীপুর জংশন: এসি আছে, শুধু বাতাস নাই। উন্নয়নের নামে গরম উপহার।”


*স্যাটায়ার না বাস্তবতা?*  


এখানে স্যাটায়ার করার কিছু নাই। কারণ বাস্তবতাই স্যাটায়ারের চেয়ে বড় কমেডি হয়ে গেছে।  


উদ্বোধন হয় – ফিতা কাটা হয় – নিউজ হয় – ফেসবুকে ছবি ওঠে। তারপর?  

তারপর বিশ্রামাগারে তালা ঝুলে, না হয় গরমে লোকে বের হয়ে যায়। ৬ মাস পর রিপোর্ট হবে “বিশ্রামাগার অব্যবহৃত, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট।”  


ঠিক যেমন ৬০ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন আজ ডিপোতে পড়ে আছে। পার্থক্য শুধু স্কেলের।


*সমাধান কি?*  


সমাধান খুব কঠিন না।  

১. উদ্বোধনের আগে চেক করো – এসি চলছে কিনা, বিদ্যুৎ লোড নিচ্ছে কিনা।  

২. ফ্যানের লাইন রাখো। এসি নষ্ট হলেও মানুষ বসতে পারে।  

৩. উদ্বোধনের বাজেটের ১০% রাখো ১ বছরের মেইনটেন্যান্সে।  


কিন্তু এই “কমনসেন্স” জিনিসটাই আমাদের সিস্টেমে সবচেয়ে আনকমন।


*শেষ কথা*  


পার্বতীপুর জংশনের এই বিশ্রামাগার এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের পারফেক্ট মেটাফোর।  

বাইরে থেকে চকচকে, ভিতরে ফাঁপা।  

ব্যানারে ডিজিটাল, বাস্তবে ম্যানুয়াল ফ্যানও নাই।  


যাত্রীরা বলে, “উদ্বোধন হইছে, কিন্তু কাজের না।”  

আর সিস্টেম বলে, “কাজের না হোক, ছবি তো উঠছে।”  


আগামী ২০ মে আবার কোনো নতুন উদ্বোধন হবে। তখন আবার বেলুন উড়বে, মাইক বাজবে।  

আর আমরা? আমরা আবার গরমে দাঁড়িয়ে বলব – “উন্নয়ন হচ্ছে তো!”


তোমার এলাকায় এমন “উন্নয়ন” দেখলে ছবি তুলে পাঠাও। নাম না বলেই পোস্ট করবো।