*৬০ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন আজ ভাঙাচোরা: স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে রূপান্তর*



২০১৩ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে নগর ও স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য আধুনিক, দ্রুতগতির ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন পূরণে চীন থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ সেট ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ডেমু ট্রেন আমদানি করা হয়। প্রতিটি সেটে তিনটি করে কোচ ছিল এবং এগুলো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। লক্ষ্য ছিল সড়কের যানজট কমিয়ে রেলকে যাত্রীবান্ধব করে তোলা।

শুরুতে ডেমু ট্রেনগুলো যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ঝকঝকে নতুন কোচ, এসি সুবিধা, কম্পন ও শব্দ কম, দ্রুত ত্বরণ ও নির্ধারিত সময়ে চলাচলের কারণে অফিসগামী ও নিয়মিত যাত্রীরা এগুলোকে পছন্দ করতে শুরু করেন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ডেমু চালু হওয়ার পর বাসের যাত্রীচাপ অনেকটাই কমে যায়। রেলওয়ে কর্মকর্তারাও আশা করেছিলেন, ডেমু হবে বাংলাদেশের কমিউটার রেল সেবার গেম চেঞ্জার।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, উদ্বোধনের মাত্র ২-৩ বছরের মধ্যেই চিত্র পাল্টে যেতে থাকে। একে একে ২০ সেট ডেমুর অধিকাংশই অচল হয়ে যায়। বর্তমানে হাতেগোনা ২-৩ সেট কোনোমতে চলছে, বাকিগুলো বিভিন্ন ডিপো ওয়াশপিটে ধুলো মেখে পড়ে আছে। ৬০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রায় পুরোটাই এখন লোকসানের খাতায়।

কেন অচল হলো ডেমু

রেলওয়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের মতে, ডেমু ট্রেনগুলো অচল হওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে।

প্রথমত, *রক্ষণাবেক্ষণের অভাব*। ডেমু একটি আধুনিক প্রযুক্তির ট্রেন। এগুলোর নিয়মিত সার্ভিসিং, কম্পিউটার ডায়াগনসিস ও বিশেষজ্ঞ মেকানিকের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ের তখন সেই অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল ছিল না। সাধারণ মেইল ট্রেনের মতো করে ডেমু মেরামতের চেষ্টা করা হয়, যা কাজে আসেনি।

দ্বিতীয়ত, *যন্ত্রাংশ সংকট*। ডেমুর অধিকাংশ যন্ত্রাংশ আমদানি নির্ভর ছিল। চীনের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি না থাকায় দ্রুত যন্ত্রাংশ পাওয়া যেত না। একটি ছোট যন্ত্রাংশের অভাবে পুরো সেট অচল হয়ে পড়ে থাকত মাসের পর মাস।

তৃতীয়ত, *কারিগরি জটিলতা ও চালক সংকট*। ডেমু চালাতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক লাগত। কিন্তু রেলওয়ে পর্যাপ্ত চালক তৈরি করতে পারেনি। ফলে চালক সংকটে অনেক ডেমু সেট চালানোই সম্ভব হয়নি।

সরকারের উদ্যোগ ও ব্যর্থতা

সমস্যা বুঝে রেলওয়ে একাধিকবার ডেমু সচল করার উদ্যোগ নেয়। চীনের কারিগরি দল আনা হয়, পাকশী ও সৈয়দপুর কারখানায় মেরামতের চেষ্টা হয়, এমনকি ডেমুকে লোকোমোটিভ দিয়ে টেনে চালানোর পরিকল্পনাও হয়। কিন্তু কোনো উদ্যোগই টেকসই হয়নি। কারণ মূল সমস্যা ছিল নীতি ও পরিকল্পনার অভাব।

রেলওয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৬০ কোটি টাকা খরচ করার আগে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়নি। শুধু ট্রেন কিনলেই হবে না, সেটি ১০-১৫ বছর চালানোর সক্ষমতাও তৈরি করতে হয়।

যাত্রীদের হতাশা

ডেমু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে আগে ৩০ মিনিটে পৌঁছানো যেত, এখন বাসে ২ ঘণ্টা লাগে। যাত্রীরা বলছেন, আধুনিক ট্রেন এনে চালাতে না পারা রেলওয়ের ব্যর্থতা।

সামনে কী করণীয়

রেলওয়ে এখন ধাপে ধাপে ডেমুগুলো পুনরায় সচল করার কথা ভাবছে। কিছু সেটকে ইএমইউ বা ইলেকট্রিক ট্রেনে রূপান্তরের প্রস্তাবও আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো ডেমু মেরামতের চেয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ভালো।

ডেমু প্রকল্প আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে: বড় বিনিয়োগের আগে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার পরিকল্পনা জরুরি। নইলে ৬০ কোটি টাকা এভাবেই লোহা হয়ে পড়ে থাকবে।

আজকের ডেমুগুলো শুধু রেলওয়ের ব্যর্থতার প্রতীক নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অব্যবস্থাপনারও উদাহরণ।