*জামালপুরে ফেসবুকে পণ্য বিক্রির নামে প্রতারণা, আটক ২*  



*লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি:* জামালপুরে ফেসবুককে ব্যবহার করে অনলাইনে পণ্য বিক্রির নামে অর্থ আত্মসাৎকারী একটি সক্রিয় চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে জেলা পুলিশ। মঙ্গলবার ১২ মে জামালপুর সদর থানায় দায়েরকৃত সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।


গ্রেফতারকৃতরা হলেন গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া উপজেলার দারিয়ারকুল এলাকার গোপাল রায়ের ছেলে বাঁধন রায় (২২) এবং ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালী উপজেলার মৃত নুর উদ্দিনের ছেলে মো. শরিফুল ইসলাম নিপু (৩৪)। পুলিশ জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।


তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি জনপ্রিয় ব্যবসায়িক ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত আইডির হুবহু নকল আইডি তৈরি করত। সেই ভুয়া আইডি থেকে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে কম দামে ইলেকট্রনিক্স, গৃহস্থালি সামগ্রী ও পোশাক বিক্রির প্রলোভন দেখানো হতো। গ্রাহকরা বিশ্বাস করে বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা পাঠালেই চক্রটি যোগাযোগ বন্ধ করে দিত। এভাবে তারা অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়।


পুলিশের ভাষ্যমতে, চক্রের মূল হোতা শরিফুল ইসলাম নিপু একটি নগদ অফিসে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির সুবাদে গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করে তিনি অবৈধভাবে সিম উত্তোলন করতেন। সেই সিমগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে বাঁধন রায়ের কাছে পাঠানো হতো। বাঁধন রায় সেই সিম ব্যবহার করে ফেইক ফেসবুক আইডি খুলতেন এবং আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতেন। এতে প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের পক্ষে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ত।


সাইবার মনিটরিং ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ চক্রটির অবস্থান শনাক্ত করে। মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে ময়মনসিংহ থেকে নিপুকে এবং সকাল ৮টার দিকে গোপালগঞ্জ থেকে বাঁধন রায়কে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একাধিক মোবাইল ফোন, সিমকার্ড ও প্রতারণায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। 


জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, বর্তমানে সাইবার প্রতারণা একটি বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করেছি। তবে সাধারণ মানুষের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। অনলাইনে কেনাকাটার আগে পেজের রিভিউ, লাইক, পোস্টের বয়স এবং লেনদেনের পদ্ধতি যাচাই করা জরুরি। অপরিচিত আইডিতে অগ্রিম টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে।


পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রতারণার কথা স্বীকার করেছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে আরও জড়িতদের তথ্য বের করার চেষ্টা চলছে। 


এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, অনলাইন কেনাকাটায় সস্তার লোভে পড়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা এখন নিত্যদিনের। পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার অপরাধ ঠেকাতে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি বাড়ানো। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। 


জামালপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন প্রতারণা রোধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেউ প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানা বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।