*কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ড: ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই প্রাণ কেড়ে নিলো ৫ দুষ্কৃতকারী, গ্রেপ্তার র‍্যাবের হাতে*


কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে র‍্যাব। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এটি পূর্বপরিকল্পিত কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল না। পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র যাত্রীবেশে অটোরিকশায় তুলে ছিনতাই করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে এই সরকারি কর্মকর্তাকে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চালক ও যাত্রীবেশে থাকা চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।



সোমবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী। তিনি জানান, গতকাল রবিবার কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সক্রিয় ৫ সদস্যকে আটক করা হয়।


*গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন*—ইমরান হোসেন হৃদয় (৩৭), মোহাম্মদ সোহাগ (৩০), ইসমাইল হোসেন জনি (২৫), মোহাম্মদ সুজন (৩২) ও রাহাতুল রহমান জুয়েল (২৭)। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, একটি চাপাতি ও একটি সুইচ গিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে।


*যেভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড*  

র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লা শহর থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠেন বুলেট বৈরাগী। অটোরিকশায় চালকের পাশাপাশি যাত্রীবেশে আগে থেকেই বসে ছিল চক্রের সদস্যরা। নির্জন স্থানে পৌঁছানোর পরই তারা বুলেটের ওপর হামলা চালায়।


গ্রেপ্তারকৃত সোহাগ, জনি ও হৃদয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুলেটকে এলোপাতাড়ি কুপাতে থাকে। এসময় তার সঙ্গে থাকা মুঠোফোন, নগদ টাকা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে চলন্ত অটোরিকশা থেকে বুলেটকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় এই কাস্টমস কর্মকর্তার।


পরদিন শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকা থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।


*পরিবারে শোকের ছায়া*  

নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর একমাত্র ছেলে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ এলাকায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।


নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়েন স্বজনরা। গতকাল রাতে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী।


*র‍্যাবের তদন্ত ও স্বীকারোক্তি*  

মামলার পর ছায়া তদন্তে নামে র‍্যাব-১। প্রযুক্তিগত সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব।


র‍্যাব কর্মকর্তা ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, “এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সাধারণ যাত্রীদের টার্গেট করে ছিনতাই ও নাশকতা চালিয়ে আসছিল। রাতে একা যাত্রী পেলেই তারা হামলা চালাতো। বুলেট বৈরাগীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।”


গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।


*উদ্বেগ বাড়ছে মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে*  

এই ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে মহাসড়কে ছিনতাই ও ছিনতাই-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি। রাতে একা চলাচলকারী যাত্রী, বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।


স্থানীয়দের দাবি, কোটবাড়ী-ময়নামতি সড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই অংশে রাতে পুলিশি টহল বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি অটোরিকশা ও সিএনজির ড্রাইভারদের তথ্য যাচাই করে নিবন্ধনের আওতায় আনারও দাবি উঠেছে।


*আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষা*  

র‍্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে হত্যা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে আদালতে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


নিহত বুলেট বৈরাগীর সহকর্মীরা জানান, তিনি অত্যন্ত সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন। বিবিরবাজার স্থলবন্দরে তার কাজের সুনাম ছিল। এমন একজন কর্মকর্তার এমন নির্মম মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন কাস্টমস বিভাগের সহকর্মীরা।


আপাতত ৫ ছিনতাইকারীর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক রহস্য উন্মোচন হলেও, পরিবার ও সহকর্মীদের দাবি—দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।