*বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে ১২৩৫ ফুট গভীরে দুর্ঘটনায় চীনা প্রকৌশলীর মৃত্যু, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন



দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ভূগর্ভে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এক চীনা প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খনির ১২৩৫ ফুট গভীরে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনায় খনি এলাকায় শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।


নিহত প্রকৌশলীর নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড-বিসিএমসিএল। খনি সূত্র জানায়, তিনি চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন-সিএমসি-র অধীনে কর্মরত ছিলেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি বড়পুকুরিয়ায় ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলন ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।


*কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা*


খনির কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের বরাতে জানা গেছে, সকালে স্বাভাবিক নিয়মে প্রকৌশলী দল নিয়ে খনির গভীরে নামেন। ১২৩৫ ফুট গভীরের একটি সাপোর্ট স্ট্রাকচার পরিদর্শনের সময় হঠাৎ ছাদের অংশ থেকে পাথর ও মাটি ধসে পড়ে। এতে তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন।


সাথে থাকা বাংলাদেশি ও চীনা শ্রমিকরা দ্রুত উদ্ধার কাজ শুরু করেন। প্রায় ৪০ মিনিট চেষ্টার পর তাকে অচেতন অবস্থায় উপরে তোলা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।


বিসিএমসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, "প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি আকস্মিক ভূতাত্ত্বিক ধস। ঘটনার সঠিক কারণ জানতে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।"


*নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন*


বড়পুকুরিয়া দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কয়লা খনি। ২০০৫ সালে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে এখানে চীনা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তির সহায়তায় কাজ চলছে। খনিটি ১৫০ ফুট গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এখানে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন হয়।


তবে শ্রমিক ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে খনির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বলেন, "গভীরে কাজের সময় পর্যাপ্ত সাপোর্ট সিস্টেম না থাকা, পুরনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার, এবং দ্রুত উৎপাদনের চাপে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। আজকের দুর্ঘটনা তারই ফল।"


২০১৭ সালেও এখানে একটি বড় দুর্ঘটনায় ৩ শ্রমিক নিহত হন। এরপর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের আশ্বাস দিলেও শ্রমিকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন হয়নি।


*পরিবার ও কূটনৈতিক তৎপরতা*


দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর ঢাকায় চীনা দূতাবাসকে জানানো হয়। দূতাবাসের প্রতিনিধিরা পার্বতীপুরে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। নিহত প্রকৌশলীর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় চীনে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।


বিসিএমসিএল কর্তৃপক্ষ জানায়, চুক্তি অনুযায়ী নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা খরচও বহন করবে কোম্পানি।


*স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া*


ঘটনার পর বড়পুকুরিয়া খনি গেটের সামনে শতাধিক শ্রমিক জড়ো হন। তারা নিহত প্রকৌশলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবিতে স্লোগান দেন।


স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, "এই খনি আমাদের এলাকার প্রাণ। কিন্তু প্রতিবার দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা ভয় পাই। সরকারের উচিত আধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।"


*বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন*


ভূতত্ত্ববিদ ড. রেজাউল করিম বলেন, "১২০০ ফুটের বেশি গভীরে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে চাপ, তাপমাত্রা ও গ্যাসের মাত্রা সবসময় পর্যবেক্ষণ করতে হয়। আধুনিক সেন্সর ও রিয়েল টাইম মনিটরিং সিস্টেম ছাড়া দুর্ঘটনা ঠেকানো কঠিন।"


তিনি আরও বলেন, চীনা প্রযুক্তি ভালো হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনা ঘটবেই।


*খনির ভবিষ্যৎ কী*


বড়পুকুরিয়া থেকে উৎপাদিত কয়লা বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। এখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব পড়ে। দুর্ঘটনার পর খনির ১ নম্বর ব্লকে উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।


খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই অংশে কাজ বন্ধ থাকবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে উৎপাদন শুরু করা হবে।


এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, গভীর খনিতে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানব নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নইলে উন্নয়নের দাম দিতে হবে প্রাণ দিয়ে।r-death